মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ১৩ এপ্রিল ২০১৭

পারমাণবিক বিদ্যুৎ জগতে বাংলাদেশের প্রবেশ

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করলে দেশের আর্থসামাজিক তথা নাগরিক জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশের জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাত প্রধানত গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার মজুদ আমাদের দেশে অত্যন্ত সীমিত। ফলশ্রুতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশকে আমদানী নির্ভর তরল পেট্রোলিয়ামের উপর বহুলাংশে নির্ভর করতে হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করার ফলে পেট্রোক্যামিক্যালস জাতীয় শিল্পদ্রব্য তৈরিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে, কৃষির জন্য সার উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে এবং এলপি গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। তেল ও কয়লা আমদানিতে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা ব্যয় হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে বটে, কিন্তু  সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। কৃষিকাজ এবং নতুন  নতুন শিল্প কারখানা  প্রতিষ্ঠা সর্বোপরি দেশের জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য আমাদের আরও অনেক বেশি বিদ্যুৎ শক্তি প্রয়োজন। এসব বিষয় বিবেচনা করে বর্তমান সরকার একটি উপযুক্ত জ্বালানী-মিশ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য দ্রুতগতিতে কাজ করা হচ্ছে। এটা নিশ্চিতভাবে বর্তমান সরকারের উত্তম প্রয়াসগুলোর একটি।

আমাদের দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৬১ সালে। সেই লক্ষ্যে পাবনা জেলার রূপপুরে প্রকল্প এলাকার জন্য প্রায় ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভূমি উন্নয়ন, অফিস, রেষ্ট হাউজ এবং বৈদ্যুতিক সাব-ষ্টেশন নির্মাণসহ ৭২টি আবাসিক ইউনিটের নির্মাণ কাজও আংশিকভাবে সম্পন্ন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের অনেকগুলো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর  তৎকালীন  সরকার  কর্তৃক ১৯৬৩-৬৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়া  সত্ত্বেও  অনিবার্য কারণে এতদ্সংক্রান্ত কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৭-৮৬ সালে এম. এস. সোপারটম কর্তৃক ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন, ‘একনেক’ কর্তৃক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (১২৫ মেগাওয়াট) অনুমোদন এবং যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জার্মানী থেকে প্রস্তাব করা হয়। ১৯৮৭-৮৮ সালে জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডের উদ্যোগে আরেকটি ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা হয়। ১৯৯০ এর শেষের দিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক কর্মকান্ড শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে উপরোক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা সত্বেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর অধিকতর নির্ভরশীলতা এবং যথোপযুক্ত পদক্ষেপের অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৬ সালে তদানীন্তন সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং  জাতীয় জ্বালানী নীতি, ১৯৯৬ এ  রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়। ১৬ অক্টোবর, ১৯৯৭ তারিখে তৎকালীন সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আই,এ,ই,এ-এর সুপারিশমালার আলোকে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রাক-বাস্তবায়ন পর্যায়ের কার্যাবলী বিশেষ করে সাইট নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রণয়ন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০০ সালে সরকার কর্তৃক Bangladesh Nuclear Power Action Plan অনুমোদিত হয়। ২০০৯ সালে সরকার “ভিশন-২০২১”- বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে ২০২১ সালের মধ্যে ২০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিতকরণকল্পে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে ১৩ মে ২০০৯ তারিখে একটি ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক একটি ‘সমঝোতা স্বাক্ষর’, ২১ মে ২০১০  তারিখে ‘Framework Agreement’ স্বাক্ষর  এবং ০২ নভেম্বর ২০১১ তারিখে  রূপপুরে প্রতিটি আনুমানিক ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা সম্পন্ন দু’ ইউনিট বিশিষ্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের নির্মাণ কার্যাদি সম্পাদনের জন্য ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের State Export Credit সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্ণিত চুক্তি মোতাবেক প্রযুক্তি সরবরাহকারি কোম্পানী রূপপুর প্রকল্পের জন্য উপযোগি সকল নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য- সম্বলিত ভিভিইআর পরিবারের সর্বাধুনিক বিদ্যুৎ চুল্লি সরবরাহ করবে। উক্ত কোম্পানি বর্তমানে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের বিভিন্ন কাজ সম্পাদনে নিযুক্ত রয়েছে।

বহুলাকাঙ্খিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মিত হলে উৎপন্ন বিদ্যুৎ জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে। দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও সচল ও মজবুত করবে। পরিবেশ দূষণের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে।

 


Share with :
Facebook Facebook